পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৯

Washington Bangla
By Washington Bangla February 25, 2016 07:43

আরিফ রহমান ● ‘পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য’ সিরিজের গত পর্বে একাত্তর সালে পাকিস্তানি বর্বর হানাদারদের রক্তাক্ত নারী নির্যাতনের মৌখিক বয়ান শুনেছি রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সুইপার রাবেয়া খাতুন এবং বীরাঙ্গনা তারা ব্যানার্জির বর্ণনায়।

লেখা পড়েই শরীরে ভয়াবহ কম্পন অনুভন করেছেন? আর যারা এই নৃশংসতার শিকার হয়েছেন পাকিস্তানি নরপিশাচগুলোর হাতে, চোখ বন্ধ করে একবার ভেবেছেন কি তাদের জায়গায় গিয়ে ১৯৭১ সালে?…

যুদ্ধকালীন নারী নির্যাতনের আরও বেশ কয়েকটি মৌখিক বয়ান শুনবো এ পর্বে—

পাবনার মোসাম্মৎ এসবাহাতুন

“১৯৭১ সালের জুলাই মাসে পাক বাহিনী আমার বাবার বাড়ী নতুন ভাঙ্গাবারীতে প্রায় ৫০ জন অপারেশনে যায়। কিছু সময় পরে আমাদের বাড়ীর মধ্যে দুজন পাক সেনা ধুকে পড়ে। তারা ঢুকে পড়ার সাথে সাথে অন্যান্য যে মেয়েরা ছিলো তারা মিলিটারি দেখে দৌড়াদৌড়ি করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু আমার কোলে বাচ্চা থাকার জন্য আমি বেরুতে পারি না। পাক সেনারা দুজন আমার ঘরে ঢুকে পড়ে। আমার বাবা ও ভাই এসে বাঁধা দিতে চাইলে একজন পাক সেনা তাদের বুকে রাইফেল ধরে রাখে আর একজন আমাকে ঘরের মধ্যে ধরে ফেলে আমার নিকট হতে আমার পাঁচ মাসের বাচ্চা ছিনিয়ে বিছানার উপর ফেলে দিয়ে আমার উপর পাশবিক অত্যাচার করে। আমার শিশু সন্তান কাঁদতে থাকে। তারপর সে আমার বাবা ও ভাই এর বুকে রাইফেল ধরে রাখে অন্যজন এসে আবার পাশবিক অত্যাচার শুরু করে। দুজন মিলে প্রায় এক ঘণ্টা আমার উপর পাশবিক অত্যাচার করে। তারপর চলে যায়। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকি। তার আধ ঘণ্টা পর আমার জ্ঞান ফিরে পাই।

02252016_10_PAKISTAN_GENOCIDE

বীরাঙ্গনা মোসাম্মৎ রাহিমা খাতুন

১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে একদিন ভোর রাত্রি আমি আমার স্বামীর সাথে ঘুমিয়ে আছি সাথে আমার সাত মাসের শিশু সন্তান, মিলিটারি আসার শব্দ পেয়ে আমার স্বামী পালিয়ে যায়। হঠাৎ প্রায় সাত জন মিলিটারি বাড়ীতে ঢুকে পড়ে এবং ঘরের দরজায় লাথি মেরে দরজা খুলে ফেলে এবং আমার শিশু সন্তানকে আমার নিকট থেকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে মাটির সাথে আছাড় দিয়ে হত্যা করে। তারপর আমাকে এক এক করে ৭ জন পাক সেনা পাশবিক অত্যাচার করে। প্রায় ঘণ্টা আমার উপর পাশবিক অত্যাচার করার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তার আধ ঘণ্টা পর আমি জ্ঞান ফিরে শুনতে পাই যে আমার তিনজন জোরকে পাক সেনারা জোর করে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর আর তাদের খোঁজ খবর পাওয়া যায় নাই। একই দিনে ঐ গ্রামের প্রায় ১০/১২ জন মহিলার উপর পাশবিক অত্যাচার করে এবং প্রায় ৭ জন মহিলাকে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বেশ কিছুদিন চিকিৎসা হবার পর আমি সুস্থ হয়ে উঠি।

02252016_11_PAKISTAN_GENOCIDE

হাতীবান্ধা, লালমনিরহাটের বীরাঙ্গনা খতিনার মৌখিক বয়ান

“কুত্তাগুলো আইসাই ঘরে ঢুকে পড়ে এবং আমাকে ডাক দিয়ে ঘরে নিয়ে যায়। আমি তো ঘরে ঢুকি না। তখন ভয় দেখায় মাইরা ফেলবে। আমি আস্তে আস্তে দরজার কাছে যেতেই ছুঁ মাইরা ঘরে নিয়া যায়। কোলের বাচ্চাটাকে একজন ফেলে দেয়। আরেকজন কাপড়-চোপড় ধইরা টানাটানি শুরু করে। আমি চিল্লান দিতে চাইছি তখন আমার মুখ চেপে ধরে কাপড়-চোপড় খুলে ফেলে শুরু করে ধর্ষণ। অন্যজন তখন দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। এভাবেই তারা আমার উপর নির্যাতন করে। এক ফাঁকে আমি অতিকষ্টে চিল্লাচিল্লি শুরু করি। তখন আমার আব্বা আসছিলেন, পায়খানায় গিয়েছিলেন, সেইখান থেকে। আব্বা যখন আমার দিকে আসছে, তখন আব্বার মাথায় বন্দুক ধরে আর বলে নড়লে গুলি করে দিব। আমাকেও বলে, যদি কোনো শব্দ করি তবে গুলি করে দিবে। আমার ভাই পশ্চিম ঘর থেকে বাইরে দৌড় দিচ্ছে তখন তারা অন্য ঘরে ঢুকে। দুইজন তো আগে থেকেই ছিল ঐ ঘরে। এই ফাঁকে আমি পালাই। পাটক্ষেতে, নির্যাতনের পরে। পালাবার সময় আমার পরনের কাপড়টা তুলে নিয়া যাই। সকালে নাস্তা খাইয়া, গুছায়া-টুছায়া ঘরে যাব। স্বামীও চলে গেছে কাজে।তখন তারা আসে। যখন নির্যাতন করে তখন কেউ ছিল না। আর থাকলেই বা কি করার ছিলো? না কিছুই করতে পারতো না। ছোট বাচ্চাটাতো কোলেই ছিলো। আর বড় বাচ্চাটা মোহাম্মদ আলীর বয়স তখন ৭/৮ বছর হবে। আলী ভয়ে ঘরে চৌকির তলে ঢুকে ছিলো। নির্যাতনের পর ঘরের সব জিনিসপত্র তছনছ করে ফেলছিলো। মনে হয় কিছু তল্লাশি করছিলো। ছোট বাচ্চাটা সেই থেকে অসুখে ভুগতে ভুগতে শেষ হইয়া যাবার ধরছে। বহু টাকা খরচ করে ভালো করছি। আর আমার পেটে যে আর একটা বাচ্চা ছিল সাত মাসের, এই নির্যাতনের দুই দিন পরে পেটেই বাচ্চাটা মারা যায়। সেটাও ছেলে ছিলো। শুধু নির্যাতন করে নাই ছুরি চাক্কু দিয়েও মারছিলো। অনেক মার মারছে। তার ওপর আবার প্রায় এক ঘণ্টা ধরে আমাকে নির্যাতন করে।”

02252016_12_PAKISTAN_GENOCIDE

হাতীবান্ধার একজন বীরাঙ্গনা কমলার বর্ণনা

“আমার তখন একেবারে কাঁচা নাড়, ৩ দিন বয়স মেয়েটার। তখন আমার ওপর চলে এই অত্যাচার। আমি বসে বসে বাচ্চার তেনা ধুইতেছিলাম কলের পাড়। এইখানে ফালাইয়া আমার ইজ্জত মারে ঐসব জানোয়ার। মানুষ তো ছিলো না। দেখতে যেমন শয়তানের মতো লাগছে, পরছিলো কেমন পোশাক জানি। কাজগুলোও করছে শয়তান-জানোয়ারের মত। কোনো মানুষের পক্ষে এই সময় এই কাজ করা সম্ভব নয়। আমি তো বসে বসে তেনা ধুইতেছি। হঠাৎ দেখি, হারামজাদা কুত্তাগুলো লাফাইয়া লাফাইয়া এসে আমার উপর পড়ছে। প্রথমে আমি তো ভয়ে চিল্লাচিল্লি শুরু করি। তারপর শুরু করে। আমি কিছু বলা কওয়ার সুযোগ পাই নাই। আমার চিল্লাচিল্লিতে তখন অনেক লোক জড়ো হইছে ঠিকই। কিন্তু সবাই খাড়াইয়া খাড়াইয়া তামাশা দেখছে। কেউ আসেনি এগিয়ে হামারে সাহায্য করতে। এক সময় আমি মরার মতো অজ্ঞান হয়ে যাই। কতোজন, কতোক্ষণ তারা এইসব করছে আমি জানি না, আমার যহন জ্ঞান আইছে তখন দেহি আমি ঘরে, আমার স্বামী আছে পাশে বসা। যখন এই ঘটনা ঘটায় তখন আমার স্বামী বাড়ী ছিলো না, বাজারে গেছিলো। কে বা কারা আমারে ঘরে আনছে, তারে খবর দিছে কিছুই কইতে পারি না। পরে ডাক্তার আইনা চিকিৎসা করায় বহুদিন পরে হামারে সুস্থ করে। পরে শুনছি লোকমুখে তারা নাকি ৪/৫ জন ছিলো। সবাই নাকি এই কাজ করেছে। আর বাইরে পাহারা দিতেছিল কয়েকজন। পরে কোন দিক দিয়ে কখন যায়, কিছু আমি জানি না। একে তো আঁতুর ঘরে কাঁচা নাড় তার ওপর আবার শত শত লোকের সামনে এই কর্মকাণ্ড করেছে। শরীরের অবস্থা কি, মনের অবস্থা কি, ঘর থেকে আর বাইরে বের হবার মতো পরিবেশ রাখেনি। এক দিক দিয়ে লজ্জা, অন্য দিক দিয়ে শরীর, কোনটাই ভালো না।”

02252016_13_PAKISTAN_GENOCIDE

নরসিংদীর জাহেদা খাতুন

“আমাকে যে কোথায় কোন ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিল তা বলতে পারিনি। পরে শুনেছি এটা ঢাকা জেলার গাজীপুর। এখন গাজীপুর একটা জেলা হয়েছে আর তেমন কিছু বলতে পারি না। কারণ কেউ তো আর কারো সাথে কথা বলতে পারতাম না। যে দুই একটা কথা হতো খুব গোপনে। ঐসব দেখতে দেখতে এবং নিজেও নির্যাতন সইতে সইতে মনে হচ্ছিলো, যদি দুইটা চোখ অন্ধ হয়ে যেত তবুও কিছুটা রক্ষা ছিলো। একদিন একজন এসে আমার কাছে দাঁড়ালো। তার পুরুষাঙ্গটা দেখিয়ে বললো, যদি তোর স্বামীকে বাঁচাতে চাস তবে কোনো শব্দ ছাড়াই আমার এটাকে খুশি করিয়ে দে– এটা শান্ত তো সব ঠিক, এই বলেই শুরু করলো। তারপর থেকে দিনরাত ঐ শয়তানগুলো আসতো আমার কাছে। এরই মাঝে একদিন চার কি পাঁচজনকে ধরে নিয়ে গেছে। রাতে শুনতে পেলাম তাদেরকে মেরে ফেলেছে।”

দুলজান, কুষ্টিয়া

যেদিন আমার এই দুর্ঘটনা ঘটে আমার বাচ্চাটার বয়স ছিলো মাত্র সাত দিন। চুল কামিয়ে আঁতুর ঘরে ধোয়া পরিস্কার করেছি। একেবারে কাচা নাড়, তার উপর এত অত্যাচার। জ্ঞান ছিলো না। গলগল করে রক্ত বইতে লাগল। সবার অবস্থা খারাপ, কিন্তু আমার অবস্থা খুব বেশি খারাপ। এই দেখেন, আমার এ বুকের মাঝে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কী করেছে। এখনো দাগ আছে। এই দুধটা আর কোনোদিন কোনো বাচ্চাদের খাওয়াতে পারিনি।

02252016_14_PAKISTAN_GENOCIDE

অনেক সময় ধর্ষণের প্রতিযোগিতা শুরু হতো। বাজি ধরে, পাল্লা দিয়ে ধর্ষণ করা হতো। এরকম ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়েছিলো জামালপুরের রেশমীর

“আমাদের এখানে একজন বিহারী ছিল, সবাই তাকে করিম পাগলা বলেই জানতো। আর সেই করিম পাগলা মান ইজ্জত মারার এক্সপার্ট ছিলো। যখন করিম পাগলা যেদিক দিয়ে হেঁটে যেতো আমার মনে হয়, তখন মাটিও ভয় পেতো। কি ক্ষমতা যে ছিলো তার এই মান ইজ্জত মারার! দিনে একইসঙ্গে কয়েকজন মহিলার মান-ইজ্জত মারতে পারতা। আর যে একবার ঐ করিম পাগলার হাতে পড়েছে, তার আর রক্ষা ছিলো না। এত শক্তি ছিলো তার, আর কৌশলও জানত জানার মতো। তার মান ইজ্জত মারার কৌশল দেখে অন্য মিলিটারিরাও বোকা হয়ে যেতো। করিম পাগলা এসব যখন করতো তখন অন্যরা দাঁড়িয়ে দেখতো আর সঙ্গে সঙ্গে তারাও উল্লাস করতো, শাবাস দিত। আর কি বিশ্রিভাবে হা হা করে হাসতো। করিম পাগলা যখন ইজ্জত মারার কাজে ব্যস্ত থাকতো, তখন অন্য কেউ এসে তার গালে মদ ঢেলে দিতো। কতজনই না তার সাথে বাজি ধরতো, কিন্তু কেউ তাকে হারাতে পারেনি। মাঝে মাঝে পাগলা বলতো, তোরা দশজন একটার পর একটা করবি, আর আমি একাই করতে থাকবো। দেখবো কে হারে, কে জিতে? তারপরও তাকে কেউ হারাতে পারেনি। সেই পাগলা ছিলো এমন। সে প্রতিদিন কত নারীর ইজ্জত যে মারতো তার কোনো হিসাব ছিলো না মনে হয়।”

02252016_15_PAKISTAN_GENOCIDE

কিরণবালা, ভালুকা, ময়মনসিংহ

“আমার পাশেই একটা মাইয়া ছিলো। দেখতে যেমন সুন্দর, বয়সটাও ছিলো ঠিক। আর তারেই সবাই পছন্দ করতো বেশি। তাই তার কষ্টও হইত বেশি। একদিন দুই তিনজন একলগে আহে। এরপর সবাই তারে চায়। এই নিয়া লাগে তারা তারা। পরে সবাই একসঙ্গে ঝাঁপায় পড়ে ঐ মাইয়াডার উপর। কে কি যে করবে, তারা নিজেরাই দিশা পায়না। পরে একজন একজন কইরা কষ্ট দেয়া শুরু করে। তখন সে আর সইতে না পাইরা একজনরে লাথি মাইরা ফেলাইয়া দেয়। তারপর তো তারে বাঁচায় কেডা। হেইডারে ইচ্ছামত কষ্ট দিয়ে মাইরা ঘর থাইকা বের হয়ে যায়। আমরা তো ভাবছি, যাক বাঁচা গেলো। কিন্তু না,একটু পরে হে আবার আহে, আইসাই বুটজুতা দিয়ে ইচ্ছামতো লাইত্থাইছে। তারপরে গরম বইদা (ডিম) সিদ্ধ করে তার অঙ্গে ঢুকায় দেয়। তখন তার কান্না, চিল্লাচিল্লি দেখে কেডা। মনে হইছিলো যে, তার কান্নায় দেয়াল পর্যন্ত ফাইটা যাইতেছে। তারপরেও একটু মায়া দয়া হলো না। এক এক করে তিনটা বইদা ঢুকালো ভিতরে। কতক্ষণ চিল্লাচিল্লি কইরা এক সময় বন্ধ হয়ে যায়।

তার পরের দিন আবার হেইডা আহে। আর কয় চুপ থাকতে। চিল্লাচিল্লি করলে বেশি শাস্তি দিবো। সেই মেয়ের কাছে গিয়ে দেখে তার অবস্থা খুব খারাপ। তখন বন্দুকের মাথা দিয়ে তার ভেতরে গুতাগুতি করছে। আরেকজন তার পেটের উপর খাড়াইয়া বইছে। আর গড় গড়াইয়া রক্ত বাইর হইতেছে। যেন মনে হয়, গরু জবাই দিছে। সে শুধু পড়েই রইলো। প্রথমে একটু নড়ছিলো পরে আর নড়লো না। তারপরেও তার মরণ হইলো না। ভগবান তারে দেখলো না। এমন কতোরকম নির্যাতন করে প্রতিদিন। এই অবস্থায় বাইচা ছিল সাত-আট দিন। পরের দুই দিন চেতনা ছিল না। এক সময় অবশেষে মরলো।”

02252016_16_PAKISTAN_GENOCIDE

গাজীপুরের পরী, তার বর্ণনা থেকেও উঠে আসে অনেক অজানা তথ্য

“গাড়িতে ওঠানোর পরই চোখ বেধে ফেললো। অনেকক্ষণ যাবার পরে একটি ক্যাম্পে নিয়ে চোখ খুললো। চোখ খোলার পরে দেখি এখানে আরো অনেক মেয়ে, সবাই চুপ করে আছে। আমি কিছু বলতে চাইলাম। কিন্তু অন্যরা ইশারায় না করলো। কিছুক্ষণ পর আমি কান্না শুরু করি। তখন পাশ দিয়ে একজন যাচ্ছিলো। সে এসেই কোন কথা না বলে আমাকে লাথি মারল এবং আমার গায়ের উপর প্রস্রাব করে দিল। এটা চলে যাওয়ার পর আমি বকাবকি শুরু করলাম। অন্যরা কিছুই বলে না। শুধু ইশারায় এটা সেটা বোঝাতে চেষ্টা করে। বিকাল হতে না হতেই বুট জুতা পরা কয়েকজন এলো। আসার পথে যেসব মেয়ে পড়ছে তাদেরকে লাথি, কিল, ঘুষি মারছে। এগুলো দেখেই আমি চুপ, একেবারে চুপ। দুই তিনজন এসে আমার ওপর নির্যাতন শুরু কররো। তারা আমাকে নিয়ে আনন্দ শুরু করলো। এমনভাবে আনন্দ করছে, যেন তাদের কাছে মনে হচ্ছে আমি একটা মরা গরু আর ঐগুলো শকুন। আমার সারা শরীরটাকে টেনে কামড়ে যা খুশি তাই করছে। একটা সময় আমি যখন আর সহ্য করতে পারছি না তখন একটু একটু কষ্টের শব্দ করছি। তখন অন্য একজন ইশারা দিলো চুপ করতে। কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম, কিন্তু আর পারছি না। নিজের অজান্তেই চিৎকার আইসা গেলো, চিৎকারের সঙ্গে শুরু করলো মাইর কারে কয়। একজন আইসা আমার মুখের মধ্যে প্রস্রাব করে দিলো। এদের ইচ্ছামতো নির্যাতন করলো এবং মারলো। যাবার সময় আবার হাত বেঁধে রাইখা গেলো। কিছুক্ষণ পর একসাথে আসলো অনেকজন। গণহারে নির্যাতন শুরু করলো। কারো মুখে কোন কথা নাই। মাঝে মাঝে শুধু একটু শব্দ আসে কষ্টের। একজন সিগারেট খাচ্ছে আর তার পাশে যে ছিলো তার গায়ে জ্বলন্ত সিগারেট ধরে রাখছে, অন্য একজন ধর্ষণ করছে। আরেকজন শকুনের মতো তার শরীর খাচ্ছে। ওর অবস্থা দেখে নিজের সব ভুলে গেলাম। কি বিশ্রীভাবে যে ধর্ষণ করছে, মোটকথা তারা আমাদেরকে মানুষ বলেই মনে করছে না। এক সময় তারা চলে গেলো। একটু-আধটু কথা বলছে সবাই। কিছুক্ষণ পর সবাই চুপ। কিছুক্ষণ পর একজন এলো এবং অন্য একটি মেয়েকে ধরে নিয়ে গেল। এর কিছুক্ষণ পর দুজন তাকে নিয়ে এলো। এসেই তার সব কাপড় খুললো এবং গরম লোহা দিয়ে তার সমস্ত শরীরে ছ্যাঁকা দিলো, শেষে তার গোপনাঙ্গের ভিতরে বন্দুকের নল ঢুকাইয়া গুলি করে মেরে ফেললো। যখন বন্দুকের নল ঢুকাচ্ছে তখন সে একটা চিৎকার দিয়েছিলো। মনে হয়, পৃথিবীর সব কিছুই তখন থমকে গেছে। তারপর তাকে নিয়ে গেল। দুই একদিন পরে জানতে পারলাম, তারা ভুল করে ঐ মেয়েকে নিয়েছিলো। তারা আমাকে নিতে এসেছিলো।”

তথ্যসূত্র:
১) বীরাঙ্গনাদের কথা – সুরমা জাহিদ
২) ‘৭১ এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ – ডা. এম এ হাসান
৩) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীর অবদান – শাহনাজ পারভিন
৪) A Tale of Millions – Rafiqul Islam BU
৫) Against Our Will : Men,Women and Rape – Susan Brownmiller
৬) Rape as a Weapon of War and it’s Long-term Effects on Victims and Society – Cassandra Clifford
৭) East Pakistan The Endgame – Brigadier A. R. Siddiqi
৮) মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ – মুনতাসীর মামুন
৯) icsforum.org
১০) ৭১-এর নারী নির্যাতন,কাজী হারুনুর রশীদ সম্পাদিত
১১) বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র,অষ্টম খন্ড,হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত
১২) ভোরের কাগজ, ১৮ মে ২০০২
১৩) আমি বীরাঙ্গনা বলছি – নীলিমা ইব্রাহীম

Washington Bangla
By Washington Bangla February 25, 2016 07:43