পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —১১

Washington Bangla
By Washington Bangla May 10, 2016 12:12

আরিফ রহমান ; আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাক বাহিনী কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনা প্রচারিত হয়েছে পুরো একাত্তর সাল জুড়েই। এর মধ্যে নির্বাচিত কয়েকটি উল্লেখ করছি। “রাজাকাররা তাদের কর্মকাণ্ড এখন হত্যা ও চাঁদাবাজিতেই আটকে রাখেনি, এখন তারা বেশ্যালয়ও খুলেছে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে তারা একটি শিবির খুলেছে যেখানে অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েদের আটকে রাখা হয়েছে, রাতে পাকবাহিনীর অফিসারদের সরবরাহ করা হয় তাদের। এছাড়াও প্রতিদিনই অনেক মেয়ে অপহরণ করছে তারা নিজেদের জন্যও, এদের অনেকেই আর ফিরে আসেনি…”
—সানডে টাইমস (২০ জুন ১৯৭১)

“ওরা আমার বাবা মা কে মেরে ফেলে, দুজনকেই বন্দুকের বাট দিয়ে পেটাতে পেটাতে মেরেছে। এরপর মেঝেতে আমাকে চিৎ করে শুইয়ে তিনজন মিলে ধর্ষণ করেছে।” এমনটা বলেছে পেত্রাপোলের উদ্বাস্তু শিবিরের এক ষোড়শী। একই প্রতিবেদনের ভাষ্য, “ভিটেমাটি ছেড়ে প্রাণভয়ে পালাতে থাকা পরিবারগুলোর মেয়েদেরও হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এরপর বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে পাকবাহিনীর কাছে। অবশ্য পরিবারগুলো মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ছুটিয়ে নিয়েছে অনেককে। যারা পারেনি, তাদের ঠাই হয়েছে রাজাকারদের খোলা বেশ্যালয়ে।”
—টাইমস (২১ জুন ১৯৭১)

“আগুনে পোড়া গ্রামকে পেছনে ফেলে দুই কিশোরী মেয়ে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পালাচ্ছিলেন চন্দ্র মন্ডল। কাদামাটির ভেতর দিয়ে। একটু পর সৈন্যদের হাতে ধরা পড়লেন। অসহায় চোখে তাকে দেখতে হলো তার মেয়েদের ধর্ষণের দৃশ্য। বারবার, বারবার, বারবার।”
—নিউজউইক (২ আগস্ট ১৯৭১)

“১১ এপ্রিল সৈন্যরা আমাদের গ্রামে এলো। একদল এসে আমাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে গেল কী যেন দেখাতে। ফিরে এসে দেখি আমার বোন নেই। আমার প্রতিবেশীর মেয়ে এবং এক হিন্দুর মেয়েও একইরকম নিখোঁজ। মে মাসের মাঝামাঝি আমার বোন আর প্রতিবেশীকে ওরা ছেড়ে দিলো। কিন্তু হিন্দু মেয়েটার খোঁজ পাওয়া গেলো না। ফিরে আসা দুজনই গর্ভবতী, বাচ্চা হবে। ওদের দিয়ে কাপড় ধোঁয়ানো হতো, এরপর প্রতিদিন দু-তিনবার করে সৈন্যদের সঙ্গে শুতে হতো।”
—নিউইয়র্ক টাইমস (১১ অক্টোবর ১৯৭১)

“সম্প্রতি পাকবাহিনী ডেমোরা গ্রাম চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে, ১২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সব নারীকে ধর্ষণ করে এবং ১২ বছরের ওপর সব পুরুষকেই গুলি করে মারে।”

—নিউজউইক (১৫ নভেম্বর ১৯৭১)

05102016_18_PAKISTAN_PREMI

উপরের সংবাদগুলোর কোনটিই কোনো দেশী পত্রিকার নয়, সবগুলোই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পত্রিকার। যাদের ধারণা পাকবাহিনী কর্তৃক বাঙালি ধর্ষণ নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তাদের অবগতির জন্যই দেয়া। তবে আরেকটা কথাও বলে রাখি, এটা কেবল বরফের ভেসে থাকা অংশের সামান্য টুকরো বিশেষ। এরকম হাজারো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে আমাদের দেশে, প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বময়— পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে।

মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীদের ধর্ষণ ছিলো একটি উদ্দেশ্যমূলক সংঘবদ্ধ ক্রিয়া, কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ‘পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য’ সিরিজের এ পর্বে আমরা আলোচনা করবো মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যাটা আসলে কত ছিলো সেই বিষয়টি নিয়ে। বাংলাদেশের সরকারি হিসেবে সংখ্যাটা ধরা হচ্ছে দুই লাখ। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়াসহ বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দাবী করা হয় মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণ হয়েছে প্রায় দুই লাখ। এখন একটু খতিয়ে দেখা দরকার এই দুই লাখ সংখ্যাটা এলো কোথা থেকে। এটাই কি একমাত্র সংখ্যা, সংখ্যাটা কি এর থেকে বেশি বা কম হওয়া সম্ভব? হলে কেন?

ডা. জিওফ্রে ডেভিস (১৯৭২)

সরকারিভাবে মুক্তিযুদ্ধের ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি ছিলো থানাভিত্তিক নিখোঁজ নারীর সংখ্যা অনুমান করে।

05102016_19_PAKISTAN_PREMI

ডা. ডেভিস লিখেছেন—

“…অংকটা এরকম: হানাদার দখলদারিত্বের সময়কালে প্রতিটি থানায় প্রতিদিন গড়ে দু’জন করে মেয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। থানার সংখ্যা ৪৮০টি এবং দখলদারিত্ব স্থায়ী হয়েছে ২৭০ দিন। ৪৮০ কে ২৭০ ও ২ দিয়ে গুণ করে পাওয়া গেছে ২ লাখ ৬৮ হাজার ২০০ জন। অন্যান্য কারণে মেয়েরা নিখোঁজ হয়েছেন ধরে নিয়ে সংশ্লিষ্ট বোর্ড সংখ্যাটাকে রাউন্ড ফিগারে এনেছেন দুই লাখে! এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের এইটাই অফিসিয়াল ধর্ষিতার সংখ্যা।”

ডা. ডেভিসের ডাইরি দ্যা চেইঞ্জিং ফেস অফ জেনোসাইড প্রথম আমাদের সামনে নিয়ে আসেন প্রখ্যাত মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এবং অনলাইনে মুক্তিযুদ্ধের ওপর সবচেয়ে তথ্যবহুল আর্কাইভ জন্মযুদ্ধের প্রতিষ্ঠাতা অমি রহমান পিয়াল। এই বইটির চমকপ্রদ অনুবাদের কষ্টসাধ্য কাজটি করার জন্য তাকে অন্তরের অন্তস্থল থেকে জানাই কৃতজ্ঞতা। বীরাঙ্গনাদের সংখ্যা নিয়ে প্রচলিত সমস্ত ধ্যান ধারণা পালটে দেয় এই বইটি।

তবে এর পরপরই ডক্টর ডেভিস বলেছেন এই হিসাবটি তার মতে ত্রুটিপূর্ণ। তার কারণ হিসেবে তিনি কিছু যুক্তিও দেখিয়েছেন—

১. সরকার আমলে নিয়েছেন শুধু নিখোঁজ রিপোর্ট পাওয়া মেয়েদের। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারগুলো চেপে গিয়েছেন তাদের মেয়েদের অবস্থান ও অবস্থা। অনেকটা লোক-লজ্জা, সম্মানহানি ও প্রাণহানির ভয়ে। এবং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যাদের কাছে অভিযোগ করবেন তাদের কাছেই মেয়ে, অর্থাৎ রক্ষকই ভক্ষক।

সাধারণভাবে দেখতে গেলে এই বিশাল অংশটা যুদ্ধকালীন সময়টায় আটকবস্থাতেই ছিল যদ্দিন না পাকসেনাদের কাছে তারা বোঝা হয়ে পড়েছে। বোঝা বলতে শারীরিক ব্যবহারের অযোগ্য গর্ভবতী কিংবা যৌনরোগগ্রস্থ, কিংবা দুটোই। এরপর মেয়ে যদি মুসলমান হয় তাহলে ছেড়ে দেয়া হয়েছে আর যদি হিন্দু হয় তাহলে মেরে ফেলা হয়েছে। অনেক মুসলমান মেয়েকেও হত্যা করা হয়েছে, অনেকে আত্মহত্যা করেছেন। এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার ও আত্মহত্যাকারীদের সঠিক সংখ্যাটা আন্দাজে বলাটা কঠিন।

২. সংখ্যাটায় পাকসেনাদের অস্থায়ী অবস্থানকে গোনায় নেওয়া হয়নি। মানে তারা একটা গ্রাম বা অঞ্চলে হামলা করলো এবং গণহারে ধর্ষণ চালালো। পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি কিন্তু আক্রমণের শিকার এরকম গ্রামের সংখ্যা বাংলাদেশের তিনভাগের এক ভাগ। সেই হিসেবে ধর্ষণের সংখ্যাও ছিলো অগণিত, যদিও সবক্ষেত্রেই গর্ভধারণ অনিবার্য ছিলোনা।

৩. রাজাকার ও পাকিস্তানের দালালরা উদ্বাস্তুদের ওপর হামলা চালিয়ে প্রচুর মেয়ে অপহরণ করেছিলো (এ ব্যাপারে আগেও বলা হয়েছে)। অনুমান করা হয় ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিলো এক কোটি বাঙালি, আর তাদের মধ্যে ১৫ লাখ ছিলেন নারী।

বাংলাদেশে আদমশুমারীর হাল বরাবরই করুণ, অনুমান নির্ভর। ১৯৭১ সালে বলা হয় সংখ্যাটা ছিলো সাড়ে সাত কোটি। এর থেকে এক কোটি লোক বাদ দিন, যারা পাশের দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছে কিংবা শহর বা নগর বা ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয়ের খোজে গেছে। বাকি থাকে সাড়ে ৬ কোটি। এদের মধ্যে ধরে নিচ্ছি দশ লাখ তরুণী-যুবতী, যারা সন্তান জন্মদানে সক্ষম। এদের এক তৃতীয়াংশ যদি ধর্ষিতা হন তাতেও সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৩ লাখ। ৩% বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই দেশে নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায় এদের অর্ধেক গর্ভধারণ করেছেন। ধর্ষণের কারণের এদের একজনও যদি গর্ভধারণ না করে (যেটা অবাস্তব), তারপরও দেড় লাখ নারী রয়ে যান যারা গর্ভবতী।

এদের সঙ্গে উপরের (১) নং বর্ণনার মেয়েদের ২ লাখ যোগ করুন (এখানে নিশ্চিত থাকতে পারেন তাদের সবাই গর্ভবতী এবং তাদের ঘরছাড়া হওয়ার পেছনে এটাই ছিলো প্রধান কারণ)। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, মেয়েদের সংখ্যা প্রতিদিন বদলাতো এবং গর্ভবতীরাই ছিল আশ্রয়হীনা। ধরে নিতে হবে দু লাখ একটা রক্ষণশীল সংখ্যা। গর্ভবতীদের ১০ ভাগ দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই সন্তান জন্ম দিয়েছেন। এভাবে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ অবাঞ্ছিত গর্ভবতীদের সংখ্যা ছিলো সাড়ে তিন লাখ। ঘটনার পরবর্তী প্রবাহের আলোকে ব্যাপারটা চমকপ্রদ।

05102016_20_PAKISTAN_PREMI

যেসব জেলা আমি ঘুরেছি, এদের বেশিরভাগেই দেখা গেছে অবাঞ্ছিত গর্ভবতীদের সংখ্যা অনুমানের চেয়ে কম। হিসেবের মধ্যে নিতে পারেন ইতিমধ্যে প্রসব করা এবং আত্মহত্যাকারীদের। সংখ্যাটা ছিল গ্রাম পিছু ১০ জন করে! যেসব জায়গায় সামরিক কর্মকাণ্ড ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী ছিল (গোটা দেশের অর্ধেক জনপদ), সেখানে যখনই কোনো গ্রামবাসীর সঙ্গে কারো মাধ্যমে যোগাযোগ করেছি অবিশ্বাস্য এক ছবি পেয়েছি।

ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ থানাপিছু ছিলো দেড়হাজার করে এবং জানুয়ারির শেষ নাগাদই গ্রামের দাই, হাতুরে ও হোমিওপ্যাথরা মিলে এদের বেশিরভাগেরই ব্যবস্থা করে ফেলে। রয়ে যায় অল্প কজনা। থানা পিছু দেড় হাজার করে ৪৮০টি থানায় (যেহেতু প্রশাসনিক ভবন, এখানে সামরিক অবস্থান দীর্ঘমেয়াদী হওয়াটাই স্বাভাবিক) ৩ লাখ ৬০ হাজার পোয়াতির সন্ধান পাওয়া যায়। অন্য যে কোনো পদ্ধতিতে হিসেব করলেও সংখ্যাটা এর ধারে কাছেই থাকবে।”

শেষ পর্যন্ত ডা. জিওফ্রে ডেভিস দেশজুড়ে তার চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতায় এবং উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় চালানো নমুনা জরিপের মাধ্যমে পরিসংখ্যান তৈরি করে জানান, ৪ থেকে ৪ লাখ ৩০ হাজার নারী মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর অস্ট্রেলিয় চিকিৎসক ডা. জিওফ্রে ডেভিস বাংলাদেশে আসেন। দেশ স্বাধীন হবার একদম পরপরই যাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছিলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুরোধে ১৯৭২ সালে। ধর্ষিত বীরাঙ্গনাদের চিকিৎসা এবং গর্ভপাতের জন্য। ‘দ্য চেঞ্জিং ফেস অব জেনোসাইড’ ডা. জিওফ্রে ডেভিসের ডায়রি। এই ডায়রিতে উঠে এসেছে অজানা অনেক তথ্য। আজকের লেখার শুরুতে দেয়া পত্রিকার বিবরণগুলোও তার ডায়রি থেকেই পাওয়া।

পাকিস্তানের নথিপত্রে বাংলাদেশে ব্যাপক হারে ধর্ষণের ব্যাপারটি অস্বীকার এবং পাকিস্তানিরা কিভাবে ধর্ষণ প্রক্রিয়াকে হালাল করেছিলো এসব প্রসঙ্গে ডা. ডেভিসের একটি সাক্ষাতকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরছি। যেটি পরবর্তীতে ডঃ মুনতাসির মামুনের ‘বীরাঙ্গনা ১৯৭২’ বইতে গুরুত্বের সাথে উঠে আসে।

প্রশ্ন : তারা নারী ধর্ষণের ব্যাপারটা কীভাবে জায়েজ করার চেষ্টা করেছে?

ডা. ডেভিস : ওরে বাপস! তাদের ওপর টিক্কা খানের এক প্রকার আদেশ বা নির্দেশই ছিলো যে, একজন সাচ্চা মুসলমান তার বাবা ছাড়া আর সবার সঙ্গেই লড়াই করবে। কাজেই তাদের যা করতে হবে তাহলো যতোটা পারা যায় বেশিসংখ্যক বাঙালি নারীকে গর্ভবতী করা। এটাই ছিলো তাদের কাজের পেছনের তত্ত্ব।

প্রশ্ন : পাকিস্তানের অসংখ্য নথিপত্রে এখনও বলা হয়, ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা অত্যন্ত বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। আপনি কি তাদের এ দাবি সত্য মনে করেন?

ডা. ডেভিস : না, না… তারা ধর্ষণ করেছে। সম্ভবত তারা প্রকৃতই যা করেছে, তার তুলনায় অনেকগুণ কম সংখ্যা দাবি করা হয়। তারা যে পদ্ধতিতে শহর দখল করতো তার বিবরণ খুব কৌতূহলোদ্দীপক। তারা তাদের পদাতিক বাহিনীকে পেছনে রেখে গোলন্দাজ বাহিনীকে সামনে নিয়ে আসতো। তারপর হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ গোলা ছুড়ে গুড়িয়ে দিতো। এর ফলে শহরে নেমে আসতো চরম বিশৃঙ্খলা আর তারপর পদাতিক বাহিনী শহরে ঢুকে পড়ে মেয়েদের বেছে বেছে আলাদা করতো। শিশু ছাড়া যৌনভাবে ম্যাচিওরড সকল মেয়েকে তারা একত্রে জড়ো করতো। আর শহরের বাকি লোকজনকে বন্দি করে ফেলতো পদাতিক বাহিনীর অন্যরা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে গুলি করে মেরে ফেলা হতো। আর তারপর মেয়েদের পাহারা দিয়ে কম্পাউন্ডে নিয়ে এসে সৈন্যদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হতো। অত্যন্ত জঘন্য একটা ব্যাপার ছিলো এটা। বিশ্বের কোথাও কখনও এমন ঘটনার নজির পাওয়া যায় না। তবুও, এমনটাই ঘটেছিলো।

05102016_21_PAKISTAN_PREMI

হ্যাঁ, যুক্তির খাতিরে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের ৬৪ হাজার গ্রামে তো পাকিস্তানি সৈন্যরা যায়নি। কথা ঠিক, ৬৪ হাজার গ্রামে পাকিস্তানি সৈন্যরা যায়নি; কিন্তু যেসব গ্রামে গেছে সেখানেই তারা মেয়েদের সর্বনাশ করেছে। আমরা এখানে যে ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছি তাতে একটি প্যাটার্ন ফুটে উঠেছে। তা হলো, গ্রামে গ্রামে তারা সুনির্দিষ্টভাবে মেয়েদের জন্য হানা দিচ্ছে, শহরাঞ্চল থেকে মেয়েদের উঠিয়ে নিচ্ছে, সে এক ভয়াবহ অবস্থা। অনেক জায়গায় রাজাকার বা শান্তি কমিটির সদস্যরা মেয়েদের তুলে নিয়ে গেছে। ধর্ষিতা নারীদের একটি অংশ আত্মহত্যা করেছে, মেরে ফেলা হয়েছে। একটি অংশের পরিবার-পরিজন ধর্ষণের কথা কখনও স্বীকার করেনি সামাজিক কারণে। ফলে সঠিক সংখ্যা কখনও জানা যাবে না। সরকারি কর্মচারীরা তখন নানাবিধ কারণে ধর্ষিতার সংখ্যা কম করে দেখাতে চেয়েছে। এর পেছনে যে মানসিকতা কাজ করেছে তা হলো এক ধরনের অপরাধবোধ। কারণ, এই মেয়েদের রক্ষার দায়িত্ব আমরা যেকোনো কারণেই হোক পালন করতে পারিনি। অনেকের কাছে এটি লজ্জার বিষয় মনে হয়েছে। এই মানসিকতার সমাজতাত্ত্বিক কারণ কি তা আমি জানি না। যে কারণে, এখনও নারী ধর্ষণের বিষয়টি পারতপক্ষে কেউ আলোচনায় আনতে চান না।

ডা. ডেভিস আরও উল্লেখ করেছিলেন, “হানাদার বাহিনী গ্রামে গ্রামে হানা দেয়ার সময় যে সব তরুণীকে ধর্ষণ করেছে তার হিসাব রক্ষণে সরকারি রেকর্ড ব্যর্থ হয়েছে। পৌনঃপুনিক লালসা চরিতার্থ করার জন্য হানাদার বাহিনী অনেক তরুণীকে তাদের শিবিরে নিয়ে যায়। এসব রক্ষিতা তরুণীর অন্তঃসত্ত্বার লক্ষণ কিংবা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে হয় তাদের পরিত্যাগ করা হয়েছে, নয়তো হত্যা করা হয়েছে।”

মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত, ধর্ষিত নারীর প্রকৃত সংখ্যা হতে পারে দশ লাখ কিংবা তার চেয়েও বেশি। অবাক হবেন না মোটেই। সিরিজের আগামী পর্বে বিস্তারিত থাকছে সেই প্রসঙ্গে। সরকারি হিসেবের যে ‘দুই লাখ’ সংখ্যাটি প্রচলিত, সেটা ভাবার মতো ভাবলেই কি শরীরে রক্ত হিম করা একটা অনুভূতি টের পাওয়া যায় না? নয় মাসে দুই লাখ বাঙালি নারী ধর্ষণ— ভাববেন কি একবার, ভাবার মতো?

(4)

Washington Bangla
By Washington Bangla May 10, 2016 12:12