সঙ্গীত শিল্পী পিনু সাত্তার… একজন ভার্সাটাইল শিল্পী

Washington Bangla
By Washington Bangla March 4, 2017 13:55

সঙ্গীত শিল্পী পিনু সাত্তার… একজন ভার্সাটাইল শিল্পী

এ্যন্থনী পিউস গমেজ, ভার্জিনিয়া : পিনু সাত্তার… একজন প্রবাসী বাংলাদেশী সঙ্গীত শিল্পী, কানাডায় বসবাস। স্থানীয়ভাবে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং টিভি অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করে তিনি প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছেন, দর্শক নন্দিত হয়েছেন পরিবেশনার মাধুর্য্যে। গানের ভুবনে বিচরন করে আসছেন অনেকটা সময় ধরে… বাংলার গ্রামীন প্রেক্ষাপটে বেড়ে উঠার সময় গ্রাম-বাংলার চিরন্তন জীবন ঘেঁষা সঙ্গীতের সাথে তার পরিচয় হয়ে গিয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। গান শুনতে শুনতেই অন্তরের গভীরে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল গান গাওয়ার নেশা, গান শেখার নেশা- গানের কথা, মর্মবাণী ছুঁয়ে যেত তার অন্তর, গানের সুরের আবেশে আন্দোলিত হতো তার আনন্দলোক। তাইতো ধীরে ধীরে সখ্যতা হয়ে যায় ‘সা রে গা মা’র সাথে আর সুর সপ্তকের সাধনায় আবিষ্ট হয় তার কন্ঠের সুরধারা। এমনিভাবে শুরু হয় তার সঙ্গীতকে ভালবেসে, সঙ্গীতকে বুকে ধারন করে এক ভিন্ন পথচলা- আর সেই নেশায় আজো পথ চলছেন একজন সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে। সঙ্গীতেই তার নির্মল আনন্দ, সঙ্গীতেই তিনি খুঁজে পান প্রানের আনন্দধারা।

রবীন্দ্রনাথের গানেই পিনু সাত্তারের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হলেও বাংলা সঙ্গীতের বাকী চার কবির গানেও পিনুর সমান পদচারনা। শুধু পঞ্চ কবির গানেই পিনু সাত্তার থেমে যাননি, তাঁর ‘কেবল গাইতে চাওয়া’ মন সমান আবেগ ও দক্ষতায় ধারন করেছে কীর্তন সহ বাংলা লোকগীতির বিভিন্ন ধারা এবং স্বর্ণযুগের বাংলা গানকেও। সমকালীন বাংলা গানের প্রতিও তাঁর রয়েছে সমান আগ্রহ।অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ শিল্পী পিনু সাত্তার। জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসেব নয়, দেয়া-নেয়ার আনন্দেই পথ চলতে পছন্দ করেন, সেটাই তার কাছে মূখ্য বিষয়। সহজ কথাগুলোকে অকপটে অতি সহজে প্রকাশ করতে পারেন প্রান খুলে। সঙ্গীতের সাধনায় বৃহত্তর ব্যপ্তিতে বিচরনের আনন্দই তার পাথেয়… সঙ্গীতকে নিয়েই চিরদিন তার পথ চলার বাসনা। “গানের ভেলায় বেলা অবেলায়- ফাগুন সন্ধ্যা অনুষ্ঠানে আসবেন তিনি গান পরিবেশন করে শ্রোতাদর্শকদের মন ভরিয়ে দিতে। তাই একদিন আলাপচারিতায় জানতে চাইলাম তার ব্যক্তিগত কিছু কথা, শিল্পী পিনু সাত্তারের পেছনের ইতিহাসের কথা।

এ্যন্থনী পিউসঃ
আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন?
পিনু সাত্তারঃ
আমার সম্পর্কে খুব একটা কিছু বলার নেই। আমি গ্রামের ছেলে, জন্ম লালন শাহ-এর দেশ কুষ্টিয়ায়। গ্রামের সহজ সরল প্রাকৃতিক পরিবেশেই আমার বেড়ে উঠা। গ্রামে বার মাসে তের পার্বন লেগেই থাকতো… বাংলার চিরায়ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উৎস হলো গ্রামীন মানুষের অকৃত্রিম প্রানের আনন্দ আর সেই আনন্দের মাঝেই বয়ে গেছে ছেলেবেলার অনেকটা সময়। আমি সিক্ত হয়েছি গ্রাম-বাংলার প্রানরসে।

এ্যন্থনী পিউসঃ
সঙ্গীতের প্রতি অনুরক্ত হলেন কিভাবে? কিভাবে এলেন সঙ্গীত জগতে?
পিনু সাত্তারঃ
উৎস ছিল গ্রামের বিভিন্ন উৎসব এবং পালা-পার্বন। এসব উৎসবের একটি বিশেষ দিক ছিল সঙ্গীত- প্রানের সঙ্গীত, যাত্রা পালা হোত, বিভিন্ন উৎসবে বিভিন্ন ধরনের গান গীত হোত সেসময়। সেগুলো শুনতে শুনতেই গানের প্রতি ভাললাগা, ভালবাসা। গান শোনা এবং গান গাওয়া- দু’টোই ভাল লাগতো আমার। সঙ্গীতের প্রতি ভালবাসা আমার একান্ত নিজস্ব অনুভূতির বিষয়, গান আমাকে সব সময় ছুঁয়ে যেত। এরপর ধীরে ধীরে সঙ্গীত আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছে, অনুপ্রানিত করেছে, সমৃদ্ধ করেছে, আলোকিত করেছে আমার পথচলা।
এ্যন্থনী পিউসঃ
শিল্পী পিনু সাত্তারের পথচলার উপর কিছুটা আলোকপাত করলে খুশী হবো।
পিনু সাত্তারঃ
ছোটবেলা থেকে গ্রামের বাউল- বোস্টমদের গান শুনে বেড়ে ওঠা আমার। গানের প্রতি ভালবাসার টানেই জড়িয়ে পড়ি গানের সাথে… শুরু হয় গান শুনে শুনে শিখে গান গাওয়ার পালা। বেশ কিছুটা সময় পর এক সময় প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্গীত শিক্ষার মধ্য দিয়ে নিজেকে ঢেলে সাজাবার বাসনা জেগে উঠেল মনের গহীনে। তাই কুষ্টিয়ার শিল্পকলা একাডেমীতে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্গীত শিক্ষার শুরু। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি যোগ দিয়েছিলাম প্রিয় ছায়ানটে। সত্যি বলতে কি- রবিঠাকুরের গান আমায় দিয়েছে ‘দ্বিতীয় জন্ম’ আর ছায়ানট আমার সেই জন্মকে দিয়েছে পূর্ণতা। বিলেত যাত্রার আগ পর্যন্ত ছায়ানটের সাথে মিশে ছিলাম… প্রানের আনন্দে!

এ্যন্থনী পিউসঃ
আপননি বিভিন্ন ধরনের গান করেন, একটি বিশেষ ঘরানায় আপনি সীমাবদ্ধ নন। এর পেছনে বিশেষ কোন কারন আছে কি? কেন আপনি একজন ভার্সাটাইল শিল্পী হতে চাইলেন?

পিনু সাত্তারঃ
আমার মূলতঃ নিতান্ত ব্যক্তিগত ভাল লাগার জন্যই গান গাওয়া। একজন শিল্পী শুধু একটি ধারার গানই করবেন বা করতে পারবেন এমন কোন কথা নেই। আসলে যে কোন শিল্পীই ইচ্ছে করলে বিভিন্ন ধারার গান করতে পারেন। আমাদের সবার প্রিয় শিল্পী মান্না দে বলেছিছেলন- ‘সা রে গা মা’ ভাল করে শিখে যাও, গান শুরু হয়ে যাবে। এই কথাগুলো আমাকে অনুপ্রানিত করেছে। অতীতে অনেক ভাল ভাল শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের গান করেছেন সমান দক্ষতার সাথে- সেসব শিল্পীরা আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস। গান ভালবাসি- তাই গান সে যে কোন ধরনের গানই হোক না কেন মিশে যেতে ইচ্ছে করে, গাইতে ইচ্ছে করে। আমাদের সঙ্গীত জগতের সমৃদ্ধ ভান্ডার জুড়ে এত বেশী সুন্দর সুন্দর গানের সম্ভার রয়েছে যে, ভাল গান গুলো সব সময়ই অন্তর ছুঁয়ে যায়… গাইতে ইচ্ছে করে। যে কোন ভাল গানের সুর-ছন্দে অন্তর আত্মা মিশে যায়!
এ্যন্থনী পিউসঃ
সময়ের পরিক্রমায় অনেক পরিবর্তন এসেছে আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চায়, সঙ্গীত জগতে। তরুন প্রজন্মের সঙ্গীত চর্চায়ও পড়ছে তার প্রভাব। আপনার অভিমত কি?

পিনু সাত্তারঃ
পরিবর্তন এসেছে, আসছে সমস্ত বিশ্বজুড়ে- পরিবর্তন জীবন এবং সভ্যতার একটি স্বাভাবিক ধারা। এটাকে নেতিবাচকভাবে আমি দেখিনা। সহজভাবে মেনে নিয়ে ভালটাকে গ্রহন করে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে হবে। শিল্পের ক্ষেত্রে, সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও তাই। সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখায় গানের চর্চা আজও অব্যাহত এবং সাথে সাথে কিছু নতুন ভাবধারা বা ফর্ম আমাদের সঙ্গীত জগতকে এবং আমাদের তরুন প্রজন্মকে প্রভাবিত করছে সন্দেহ নেই- যেমন ব্যান্ড সঙ্গীত। এতে খারাপ কিছু নেই- ব্যান্ড একটি নতুন ফর্ম বা একটি নতুন ভাবধারা, ব্যান্ড-এ অনেক ভাল ভাল গান হচ্ছে। এছাড়া আমাদের তরুন প্রজন্মকে নেতিবাচক সমালোচনা না করে বরং ওদের গানের প্রতি উৎসাহিত করলে আমাদের সঙ্গীত জগৎ আরো সমৃদ্ধ হবে আগামী সময়ে। আমাদের তরুন প্রজন্ম ভবিষ্যতে আরো অনেক ভাল কিছু উপহার দিতে পারবে বলে আমি বিশ্বাসী এবং আশাবাদী। এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলবে সৃষ্টির ধারা।

এ্যন্থনী পিউসঃ
প্রবাসে আপনার সঙ্গীত চর্চা কিভাবে চলছে? প্রবাসে সঙ্গীত চর্চার করার সুযোগ কতটুকু?

পিনু সাত্তারঃ
ভাল… অনেক ভাল। প্রবাসের আঙ্গিনায় আমাদের মানুষগুলো দেশের সংস্কৃতি এবং সঙ্গীতকে প্রান দিয়ে ভালবাসে। প্রবাসী হয়ে মাতৃভূমি থেকে দূরে থাকার কারণে আমরা সবাই স্বদেশী সংস্কৃতি এবং জীবনধারাকে মিস করি ভীষণভাবে। তাই দেশ থেকে দূরে থেকেও অন্তরের গভীরে আমাদের স্বদেশী সংস্কৃতির প্রতি রয়েছে গভীর ভালবাসা। এছারা ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে, প্রবাসে এসে থেমে থাকেনি আমার সঙ্গীত চর্চা। দেশে থাকাকালীন সময়ে যেমন গান শুনিয়ে আনন্দ পেয়েছি বিভিন্ন জেলার শ্রোতাদের, তেমনি কোলকাতা, শান্তিনিকেতন, আগরতলার মত বিভিন্ন জায়গাতেও শ্রোতারা ভালবেসেছে আমার গান। বিলেতের লন্ডন শহর ছাড়াও আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে গান পরিবেশন করেছি অক্সফোর্ড, লীডস, এবং নটিংহ্যম-এ। ইংল্যান্ড ছাড়াও গান শুনিয়েছি জার্মানির কোলন শহরে, আমেরিকার নিউ ইয়র্ক ও আরিজোনায়। এছাড়া ভ্যাঙ্কুভারে টেগোর সোসাইটির আমন্ত্রণে একক সঙ্গীত সন্ধ্যায় গান পরিবেশন করার সুযোগ পেয়ে আমি আনন্দিত। সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশনে, টরন্টো, মন্ট্রিয়াল ও সাস্কাটুনেও হয়ে গেল আরও কিছু সঙ্গীতানুষ্ঠান। গান গেয়েই আমার আনন্দ আর শ্রোতাদর্শকগন আনন্দ পেলে তা আমাকে ভীষনভাবে আপ্লুত করে, অনুপ্রানিত করে- এ যেন আমার অমূল্য প্রাপ্তি, সাধনার পূর্নতা।
এ্যন্থনী পিউসঃ
আপনি নিজে একজন শিল্পী। নিজেকে ছাড়া আর কোন কোন শিল্পীর গান ভাল লাগে?

পিনু সাত্তারঃ
আমি গান ভালবাসি এবং অনেক শিল্পীর গানই ভাল লাগে। যে কোন ভাল গান আমাকে স্পর্শ করে যায়, বিশেষ করে পঞ্চকবির গান এবং স্বর্ন যুগের গান আমার অন্তর ছুঁয়ে যায়। এছাড়া এমন অনেক লোকগীতিও আছে যেগুলো আমার খুবই ভাল লাগে। তাই আমাদের সঙ্গীত জগতের অসংখ্য শিল্পী আছেন যাদের গান আমার ভাল লাগে, যাদের গান শুনে আমার মন-প্রান আপ্লুত হয়ে যায়।

এ্যন্থনী পিউসঃ
সঙ্গীত নিয়ে আপনার কোন ভবিষ্যৎ স্বপ্ন?

পিনু সাত্তারঃ
আমরা যেভাবে সঙ্গীত শিখেছি, যেভাবে পেয়েছি… তার ধারা এখন পরিবর্তন হয়েছে, যোগ হয়েছে আধুনিক পদ্ধতি এবং নতুন ভাবধারা। কিন্তু মূল কথা হচ্ছে তরুন প্রজন্মের মাধ্যমে এই ধারা যেন অব্যাহত থাকে… ওদের মাঝেই বেঁচে থাকবে আমাদের সঙ্গীতের সমৃদ্ধ সৌকর্য। এছাড়া তরুন প্রজন্মকে নিয়ে কাজ করতে চাই। ওদের মাঝ থেকে বেড়িয়ে আসুক আরো অনেক সৃষ্টিশীল গীতিকার, সুরকার, শিল্পী- ওরাই বহন করে নিয়ে যাক আমাদের গৌরবান্বিত সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য- এটাই আমার চাওয়া, আমার স্বপ্ন। এছাড়া গান গেয়ে যাচ্ছি, গান গেয়ে যাবো- কারণ সঙ্গীতকে অন্তর দিয়ে ভালবাসি, সঙ্গীতার মাঝেই খুঁজে এক ভিন্ন আনন্দলোকের অমিয়ধারা, সিক্ত হতে চাই আজীবন!

এ্যন্থনী পিউসঃ
এই প্রথমবারের মত ওয়াশিনটনে আসছেন “গানের ভেলায় বেলা অবেলায়- ফাগুন সন্ধ্যায়” অনুষ্ঠানে গান গাইতে। কেমন লাগছে? আপনার অনুভূতি কি?

পিনু সাত্তারঃ
খুব ভাল লাগছে ভাবতে যে ওয়াশিংটনে আমাদের প্রবাসী বাঙালি শ্রোতা-দর্শকদের সাথে দেখা হবে, পরিচয় হবে। আমি এক্সাইটেড। এছাড়া আপনাদের এই আয়োজনের জন্য আমি আনন্দিত এবং কৃতজ্ঞ। অপেক্ষায় আছি সবাইকে নিয়ে একটি সুন্দর সঙ্গীত সন্ধ্যা কাটাতে- এইতো আমাদের সংস্কৃতি, এইতো আমাদের আনন্দের উৎস, আর সবাইকে নিয়ে আনন্দে মেতে উঠার অনুভূতিই আলাদা। ওয়াশিংটনবাসী বাঙালি ভাই-বোনেরা, আপনারাও সবাই আসুন এই সুন্দর আয়োজনে আমাদের সাথে থাকার জন্য- আপনাদের প্রতিক্ষায় রইলাম।

অতপরঃ পিনু সাত্তারের কাছ থেকে বিদায় নেবার পালা… ধন্যবাদ ও শুভরাত্রি জানিয়ে বিদায় নিলাম। ভালো লাগলো শিল্পী পিনু সাত্তারের সাথে কথা বলে, ব্যক্তি পিনু সাত্তার এবং শিল্পী পিনু সাত্তার সম্পর্কে অনেক কথা জেনে। আমরাও দিন গুনছি ১৮ই মার্চের সন্ধ্যায় সবাইকে নিয়ে সঙ্গীতের সুধারসে সিক্ত হতে।

(0)

Washington Bangla
By Washington Bangla March 4, 2017 13:55